বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা
ভূমিকা: ভৌগোলিক পরিবেশের তারতম্যের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। আর এ বৈচিত্র্যের কারণে নৃবিজ্ঞানীরা সমগ্র মানবজাতিকে বিভিন্ন বিভাগে ও উপবিভাগে বিভক্ত করেন। বাংলাদেশে নানান জনগোষ্ঠীর মধ্যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অন্যতম। আমাদের দেশের বিভিন্ন উপজাতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য উপজাতির মতোই অশিক্ষিত। এসব উপজাতির জীবনধারার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা উপজাতি বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে অন্যতম।
চাকমা সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা
নিম্নে বাংলাদেশের চাকমা উপজাতির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো।
১। বাসস্থান:
বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তিনটি জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। বাংলাদেশের এ তিনটি জেলাতেই চাকমারা বসবাস করে। তবে এ তিনটির মধ্যে রাঙামাটি জেলায় সবচেয়ে বেশি চাকমার বাস। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও বেশ কিছু সংখ্যক চাকমা বসবাস করে।।
২. নামকরণ:
বয়স্ক শিক্ষিত চাকমাগণ নিজেদের জন্য চাকমা নামটিই ব্যবহার করেন। অপরপক্ষে, চাকমা সমাজের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী চাকমা নামেই নিজেদের পরিচয় দেন। বর্তমান শিক্ষিত যুবক চাকমাদের অনেকেই চাকমার চেয়ে ‘চাঙমা’ নামটি ব্যবহারে পক্ষপাতি।
৩. জনগণ:
জনসংখ্যার দিক থেকে চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম উপজাতি। ১৯৯১ সালের লোক গণনার হিসেবে বাংলাদেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিন জেলায় চাকমা জনসংখ্যা ছিল সর্বমোট প্রায় ৩ লক্ষ। চাকমারা মোট ট্রাইবাল জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
৪. ভাষা:
বর্তমানে চাকমারা একটি বাংলা উপভাষায় কথা কলে। ভাষাগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চাকমারা আগে ‘টিবোটা’ বার্মী ভাষা পরিবারভুক্ত আরাকানি ভাষায় কথা বলত। পরবর্তীতে তারা ইংন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রতিবেশী বাংলা ভাষা গ্রহণ করে। চাকমাদের নিজস্ব লিপি আছে। তাতে আরাকানি অক্ষরের প্রাধান্যই বেশি। তবে চাকমারা লেখার কাজে বাংলা হরফ ব্যবহার করে।
৫. নরগোষ্ঠীগত পরিচয়:
চাকমাদের মধ্যে মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর প্রভাব সমতলবাসী বাঙালিদের তুলনায় অনেক বেশি। চাকমাদের সাথে চীনা মঙ্গোলয়েডদের যথেষ্ট মিল। তারা উচ্চতায় মাঝারি থেকে বেঁটে। দৈহিক গড়নেও এরা বেশ শক্তিশালী।
৬. ধর্ম:
চাকমারা হীনযানপন্থি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে। চাকমাদের গ্রাম্য এলাকায় বৌদ্ধ মন্দির ক্যাং দেখতে পাওয়া যায়। চাকমারা গোজেন নামের ঈশ্বরকে খুবই ভক্তি শ্রদ্ধা করে।
৭. চাকমা সমাজের গড়ন:
চাকমা সমাজের ক্ষুদ্র সংগঠন হলো পরিবার। এরপর রয়েছে গোত্তি বা গোজা। এর চেয়ে বৃহৎ আয়তনের সামাজিক একক হলো আদাম বা পাড়া। তার চেয়ে অধিক আয়তন হলো গ্রাম বা মৌজা। মৌজার পরে বৃহত্তর চাকমা সমাজ সংগঠন হলো চাকমা সার্কেল বা চাকমা ট্রাইবাল সংগঠন।
৮. পরিবার:
চাকমা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের ক্ষমতা স্বামীর হাতে বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত। সম্পত্তি বা বংশপরিচয় পিতা থেকে পুত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তায়। বিয়ের পর চাকমা দম্পত্তি স্বামীর পিতৃগৃহে বা পিতার গ্রামে বসবাস করে। অর্থাৎ পিতৃবাস এবং নয়াবাস রীতি অনুসৃত হয়।
৯. বিবাহ:
চাকমাসমাজে Cross cousin বিবাহ প্রচলিত আছে। অর্থাৎ মামাতো ভাই-বোন যা ফুফাতো ভাই বোনদের মধ্যে বিবাহ হয়ে থাকে। তাদের মাঝে প্যারালাল কাজিন বিবাহও সীমিত অর্থে প্রচলিত। তবে আপন চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে অনুষ্ঠানে সামাজিক বাঁধা নিষেধ রয়েছে।
১০. বিবাহবিচ্ছেদ:
চাকমাসমাজে খুব কমই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহ বিচ্ছেদ একান্ত জরুরি হলে গ্রামে সালিস বসে। স্ত্রী দোষী হলে স্বামী-স্ত্রীকে দেয়া পোশাক ও গহনাপত্র দাবি করতে পারে। অপরপক্ষে, স্বামী দোষী হলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। এভাবে সালিশের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেন ঘটে।
১১. নেতৃত্ব:
আদামের নেতৃত্বে কারবারি, মৌজার নেতৃত্বে হডম্যান এবং চাকমা উপজাতি তথা সার্কেলের নেতৃত্বে চাকমা রাজার ব্যবস্থা এখনো রয়েছে। তবে বর্তমানে নেতৃত্বে কিছু প্ররিবর্তন লক্ষ করা যায়।
১২. খাদ্য ও বাসস্থান:
চাকমাদের প্রধান আহার্য দ্রব্য হলো ভাত ও মদ। মদ এরা নিজেরাই তৈরি করে নেয়। তারা মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উচুতে মাচার উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বাস করে। ঘরটিকে কয়েকটি কামরায় ভাগ করা হয়ে থাকে।
১৩. পোশাক-পরিচ্ছদ:
চাকমা পুরুষদের পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে ধুতি পাঞ্জাবি উল্লেখযোগ্য। নারীদের ব্যবহার্য পোশাক পরিচ্ছেদ হলো পিন্দন, খাদি, খালাং ইত্যাদি। আজকাল শিক্ষিত নারীরা শাড়ি ও ব্লাউজ পরিধান করে।
১৪. শিল্প ও সংস্কৃতি:
চাকমাদের শিল্প সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়। বাংলা লোকসাহিত্য সমৃদ্ধশালী করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান কম নয়। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের ফলে চাকমাদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তনের ঢেউ।
১৫. অর্থনীতি:
চাকমারা জুম চাষের উপর বেশি নির্ভরশীল। তাদের জন্য ব্যক্তি মালিকানায় জমি বরাদ্দ দেয়া আছে। বর্তমান চাকমারা হালচাষ পদ্ধতি শিখছে। দুই পাহাড়ের সমতল অংশে চাকমারা ধান চাষ করে থাকে। তারা রাবার চাষ ও কাঠের গাছ চাষ করে থাকে।
১৬. চাকমাদের শিক্ষা:
অন্যান্য উপজাতির তুলনায় চাকমার বেশি শিক্ষিত। তারা বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছে অধিকহারে। বর্তমানে উচ্চশ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে উপজাতীয় কোঁটা পদ্ধতিতে এরা সুযোগ পাচ্ছে। তারা সভ্যসমাজের লোকদের মত চাকরি এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত।
১৭. খেলাধুলা:
চাকমাদের মধ্যে হা-ডু-ডু খেলা ফার খেলা, লাটিম খেলা, কুস্তি, রশি টানাটানি, সাঁতার ও দৌড় প্রতিযোগিতা প্রচলিত ছিল। ছেলেদের প্রিয় খেলা ছিল পাটি খেলা, গিলা খেলা প্রভৃতি।
১৮. কুসংস্কার:
অনেকের মতে চাকমা সমাজে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। কারণ তাদের মধ্যে দৈত্য দানবে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। রোগ মুক্তির জন্য তারা ঝাঁড় ফুঁকে বিশ্বাস করত, যা আধুনিক সমাজব্যবস্থার সাথ পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৯. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া:
চাকমা সমাজে মৃতদেহ আগুনে পোড়ানো হয়। তবে, সাত বছরের কম বয়সিদের কবর দেয়া হয়। মৃত্যুর সাত দিন পর মৃতের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্য সাতদিন্যা নামের এক অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে মৃতের আত্তার জন্য খাদ্য, মদ, অর্থ, কাপড় ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, পরিবর্তনে তথা সমাজ ও সরকারের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে চাকমাদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বর্তমানে চাকমা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ধর্মের পরিবর্তদের ক্ষেত্রে এক জাগরণ এসেছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, ভবিষ্যতে চাকমারা সভ্যসমাজে আসতে সক্ষম হবে।

No comments:
Post a Comment